জাতীয় নির্বাচনের ফল গণনা শুরু হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক বাতাসে যেন আচমকা দিক পরিবর্তন হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই মনে হয়—সবাই একসুরে কথা বলছে, সবাই একই পতাকার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই স্রোত কি দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, নাকি ফলাফলের আলো দেখেই অবস্থান পুনর্নির্ধারণ?
ফলাফল স্পষ্ট হতে না হতেই দেখা গেল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট ২১৩টি আসনে এগিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–সমর্থিত জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া এই নির্বাচনের ফলাফল রাজনীতির মানচিত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত যে কণ্ঠগুলো ছিল নীরব, সেগুলো হঠাৎ করেই উচ্চকিত হয়ে ওঠা—এ দৃশ্যই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতাদর্শের বিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—পরিবর্তনটি কি দীর্ঘ চিন্তা ও মূল্যবোধের রূপান্তরের ফল, নাকি ক্ষমতার সম্ভাব্য কেন্দ্রকে ঘিরে দ্রুত পুনর্বিন্যাস? সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও অনুরূপ দৃশ্য দেখা গেছে। তখন অনেকেই দ্রুত নিজেদের অবস্থান বদলেছেন। এখন আবার নির্বাচনী ফলাফলের প্রেক্ষাপটে একই প্রবণতা দৃশ্যমান।
ফল গণনার মধ্যবর্তী সময় থেকেই সামাজিক মাধ্যমে তারেক রহমান–কে ঘিরে প্রশংসার স্রোত চোখে পড়ে। যারা এতদিন প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি, তারাও দৃঢ় ভাষায় নতুন রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করছেন। কারও কারও বক্তব্যে এমন আভাস মেলে, যেন দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা এই ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই উচ্চারণ কি দীর্ঘ রাজনৈতিক বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, নাকি সময়োপযোগী কৌশল?
রাজনীতিতে সুবিধাবাদ শব্দটি নতুন নয়। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদল মানুষ সব সময়ই নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে থাকেন। তাঁরা সচরাচর পরাজিত শিবরে থাকতে চান না। বিজয়ের সম্ভাবনা যেদিকে, তাঁদের আনুগত্যও সেদিকেই। এতে ব্যক্তিগত সুবিধা মিলতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এটি কতটা স্বাস্থ্যকর—সে প্রশ্ন উন্মুক্ত।
বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। আজকের যুব সমাজ সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক মত প্রকাশে সক্রিয়। কিন্তু তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আবেগ ও অ্যালগরিদমের ভিড়ে নীতিগত অবস্থান ধরে রাখা। গণতন্ত্র টিকে থাকে সুসংহত মতাদর্শ, জবাবদিহি ও নৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর; কেবল বিজয়ী পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতার ওপর নয়।
অবশ্যই রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনশীল। দল বদল, মত বদল—সবই গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু যদি এই পরিবর্তন আদর্শভিত্তিক না হয়ে কেবল সম্ভাব্য ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে বরং দুর্বল করে। কারণ এতে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়।
সময়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—বর্তমান এই অবস্থান পরিবর্তন আদর্শগত রূপান্তর, নাকি ফলাফল-নির্ভর সমীকরণ। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: গণতন্ত্রে কেবল বিজয় নয়, রাজনৈতিক সততাই সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই সততার পরীক্ষা হয় ক্ষমতার প্রান্তে নয়, বরং প্রতিকূলতার মুহূর্তে।
জাতীয় জীবনের এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন। বিজয়ের উল্লাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নীতির প্রতি অটল থাকা। অন্যথায় আমরা হয়তো প্রতি নির্বাচনের পরই দেখব নতুন এক “ফলাফল ঋতু”—যেখানে পতাকা বদলায় দ্রুত, কিন্তু রাজনৈতিক চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ রানা আহমেদ । প্রধান সম্পাদক: মোঃ ফজলে রাব্বি। নির্বাহী সম্পাদক :হৃদয় হাসান ।বার্তা সম্পাদক : মাহাবুব হোসেন। মোবাইল অফিস: ০১৮৫৮৪১৬৮৭২।
ই-পেপার