০৯:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে নীলফামারীর ঐতিহাসিক হরিশ্চন্দ্র রাজার বাড়ি

Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৯:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
  • / ১৯১ Time View

 

নীলফামারী প্রতিনিধি:

 

সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার খুটামারী ইউনিয়নের ঐতিহাসিক হরিশ্চন্দ্র রাজার বাড়ি আজ পরিণত হয়েছে এক অবহেলিত ধ্বংসস্তূপে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘হরিশ্চন্দ্র পাঠ’ নামে, এ রাজবাড়িটি একসময় ছিল প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ইতিহাস মতে, ব্রিটিশ আমলে এই রাজবাড়িতে বিচার কাজ, পুঁথি পাঠ, পূজা-পার্বণসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। বাড়িটির নামানুসারে পুরো গ্রামটির নাম হয়ে যায় ‘হরিশ্চন্দ্র পাঠ’। বর্তমানে প্রায় পৌনে দুই বিঘা জমির ওপর রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ মাটির ওপরে দৃশ্যমান থাকলেও এটি এখন অরক্ষিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয়দের মতে, মূল রাজবাড়ির কাঠামো ছিল একটি উঁচু ঢিবির ওপর, যার উচ্চতা একসময় ছিল ৪০ থেকে ৪৫ ফুট। সময়ের সঙ্গে তা ক্ষয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০-১২ ফুটে। ঢিবির মাঝখানে থাকা পাঁচটি বিশাল কালো পাথরের ঘেরা জায়গাটি ছিল রাজবাড়ির মূল স্থাপনা। জনশ্রুতি রয়েছে, এক রাতে পুরো কাঠামোটি অলৌকিকভাবে মাটির নিচে দেবে যায়।

সাবেক ইউপি সদস্য অতুল রায় বলেন, “এই জায়গার অনেক ইতিহাস আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। মাঝে মাঝে পাথরের অংশগুলো আবার মাটির উপর ভেসে ওঠে।”

প্রতিবছর ১লা ফাল্গুনে এই স্থানে ঐতিহ্যবাহী ‘শিবরাত্রি মেলা’ বসে। মেলায় স্থানীয় হস্তশিল্প ও পণ্যের সমাহার দেখা যায়—গুড়ের জিলাপি, চিনির বাতাসা, কাঠ ও মাটির তৈরি পণ্য, আসবাবপত্র ও খেলনা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, একটি টিনশেড মন্দির এবং কিছু ধ্বংসাবশেষ ছাড়া তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। রয়েছে একটি পুরোনো বিশাল বটগাছ, যার শাখায় একসময় হাজারো হরিতাল পাখির কিচিরমিচিরে মুখর ছিল এলাকা।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা উপেন্দ্র চন্দ্র রায় (৭৩) বলেন, “এই স্থানে কেউ কিছু নিলে নাকি রক্তপাত হয়ে মৃত্যু ঘটে। সেই ভয়েই এটি অলৌকিক স্থান হিসেবে পরিচিত।”

১৯৯৮ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এলাকাটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হয়। তবে এরপর আর কোনো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, “এই এলাকাটিকে পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, “জেলায় অনেক পুরাকীর্তি রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে।”

উল্লেখ্য, নীলফামারী জেলায় আরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু পুরাকীর্তি—ভীমের মায়ের চুলা, পাল রাজার বাড়ি, বাহালী পাড়া জমিদার বাড়ি, টুপামারী কাছারিবাড়ি, বিন্না দিঘি (নীলসাগর), নীলকুঠি ও দূর্বাছড়ি গ্রামের মোগল আমলের স্থাপত্য।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে নীলফামারীর ঐতিহাসিক হরিশ্চন্দ্র রাজার বাড়ি

Update Time : ১১:২৯:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫

 

নীলফামারী প্রতিনিধি:

 

সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার খুটামারী ইউনিয়নের ঐতিহাসিক হরিশ্চন্দ্র রাজার বাড়ি আজ পরিণত হয়েছে এক অবহেলিত ধ্বংসস্তূপে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘হরিশ্চন্দ্র পাঠ’ নামে, এ রাজবাড়িটি একসময় ছিল প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ইতিহাস মতে, ব্রিটিশ আমলে এই রাজবাড়িতে বিচার কাজ, পুঁথি পাঠ, পূজা-পার্বণসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। বাড়িটির নামানুসারে পুরো গ্রামটির নাম হয়ে যায় ‘হরিশ্চন্দ্র পাঠ’। বর্তমানে প্রায় পৌনে দুই বিঘা জমির ওপর রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ মাটির ওপরে দৃশ্যমান থাকলেও এটি এখন অরক্ষিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয়দের মতে, মূল রাজবাড়ির কাঠামো ছিল একটি উঁচু ঢিবির ওপর, যার উচ্চতা একসময় ছিল ৪০ থেকে ৪৫ ফুট। সময়ের সঙ্গে তা ক্ষয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০-১২ ফুটে। ঢিবির মাঝখানে থাকা পাঁচটি বিশাল কালো পাথরের ঘেরা জায়গাটি ছিল রাজবাড়ির মূল স্থাপনা। জনশ্রুতি রয়েছে, এক রাতে পুরো কাঠামোটি অলৌকিকভাবে মাটির নিচে দেবে যায়।

সাবেক ইউপি সদস্য অতুল রায় বলেন, “এই জায়গার অনেক ইতিহাস আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। মাঝে মাঝে পাথরের অংশগুলো আবার মাটির উপর ভেসে ওঠে।”

প্রতিবছর ১লা ফাল্গুনে এই স্থানে ঐতিহ্যবাহী ‘শিবরাত্রি মেলা’ বসে। মেলায় স্থানীয় হস্তশিল্প ও পণ্যের সমাহার দেখা যায়—গুড়ের জিলাপি, চিনির বাতাসা, কাঠ ও মাটির তৈরি পণ্য, আসবাবপত্র ও খেলনা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, একটি টিনশেড মন্দির এবং কিছু ধ্বংসাবশেষ ছাড়া তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। রয়েছে একটি পুরোনো বিশাল বটগাছ, যার শাখায় একসময় হাজারো হরিতাল পাখির কিচিরমিচিরে মুখর ছিল এলাকা।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা উপেন্দ্র চন্দ্র রায় (৭৩) বলেন, “এই স্থানে কেউ কিছু নিলে নাকি রক্তপাত হয়ে মৃত্যু ঘটে। সেই ভয়েই এটি অলৌকিক স্থান হিসেবে পরিচিত।”

১৯৯৮ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এলাকাটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হয়। তবে এরপর আর কোনো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, “এই এলাকাটিকে পর্যটন উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, “জেলায় অনেক পুরাকীর্তি রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে।”

উল্লেখ্য, নীলফামারী জেলায় আরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু পুরাকীর্তি—ভীমের মায়ের চুলা, পাল রাজার বাড়ি, বাহালী পাড়া জমিদার বাড়ি, টুপামারী কাছারিবাড়ি, বিন্না দিঘি (নীলসাগর), নীলকুঠি ও দূর্বাছড়ি গ্রামের মোগল আমলের স্থাপত্য।