চৌগাছার ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বলুর মেলা শুরু ১৫ আগস্ট পীর বলু দেওয়ানের রওজা শরীফ ঘিরে উৎসবের আমেজ,
- Update Time : ০১:৪৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৯ Time View

মোঃ শহিদুল ইসলাম চৌগাছা উপজেলা প্রতিনিধি:
যশোরের চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের হাজরাখানায় আগামী ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাচ্ছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বলুর মেলা। পীর বলু দেওয়ানের স্মৃতিবিজড়িত এই মেলা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বড় আয়োজন হিসেবে পরিচিত। মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রতিবছরের মতো এবারও দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন আয়োজক ও স্থানীয়রা। ঐতিহ্যবাহী এই মেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান পীর বলু দেওয়ানের রওজা শরীফ। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস ও মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই রওজা শরীফ কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত। কপোতাক্ষের নির্মল পরিবেশ, নদীর তীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং রওজা শরীফকে ঘিরে মেলার আয়োজন প্রতি বছরই মানুষের মধ্যে আলাদা আকর্ষণ সৃষ্টি করে। শুধু মেলা নয়, পীর বলু দেওয়ানের রওজা শরীফকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আবেগ ও লোকজ সংস্কৃতির চর্চা চলে আসছে। কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থানটি মেলার সঙ্গে এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী আবহ তৈরি করেছে। ফলে মেলা উপলক্ষে চৌগাছা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী মহেশপুর, ঝিকরগাছা, শার্শা, কেশবপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ হাজরাখানায় ছুটে আসেন। প্রায় দুই শতাব্দীর পথ পেরিয়ে আসা বলুর মেলা এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক বা বিনোদনমূলক আয়োজন নয়; এটি স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও পারস্পরিক মিলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই মেলায় অংশ নিয়ে আসছে। অনেকের কাছে মেলা মানেই শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সঙ্গে আনন্দের সময় এবং গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়া। মেলায় শিশুদের খেলনা, মিষ্টান্ন, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প, বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও নানা বিনোদনের আয়োজন থাকে। মেলার মাঠে মানুষের ভিড়, দোকানিদের হাঁকডাক, শিশুদের আনন্দ আর পরিচিত-অপরিচিত মানুষের মিলন—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে এই আনন্দের মধ্যেও এবার স্থানীয় মানুষের একটি বড় উদ্বেগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর মেলার বিভিন্ন বিনোদন আয়োজন, বিশেষ করে কিছু বিনোদন নৌকা ও প্রদর্শনীকে ঘিরে অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও আপত্তিকর পরিবেশের অভিযোগ উঠেছিল। এতে পরিবার নিয়ে মেলায় আসা অনেক দর্শনার্থী বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন বলে দাবি স্থানীয়দের।
সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বিনোদনের নামে এমন কোনো কর্মকাণ্ড থাকা উচিত নয়, যা শিশু-কিশোর, নারী ও পরিবারের সদস্যদের সামনে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। তাদের মতে, মেলার মূল উদ্দেশ্য মানুষের আনন্দ ও বিনোদন দেওয়া হলেও তা অবশ্যই সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এবার মেলা শুরুর আগে তাই গত বছরের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আয়োজক কমিটি ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বলুর মেলা তাদের গর্বের ঐতিহ্য। এখানে বিনোদন থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই বিনোদন হতে হবে রুচিশীল, শালীন ও পরিবারবান্ধব। নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও বয়স্করা যেন কোনো ধরনের অস্বস্তি ছাড়াই মেলায় ঘুরতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত আয়োজকদের প্রধান লক্ষ্য। তাদের দাবি, মেলা শুরুর আগেই সব ধরনের বিনোদন আয়োজনের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে নৌকা, মঞ্চ, নৃত্য বা অন্যান্য বিনোদনমূলক আয়োজনের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অশ্লীলতা কিংবা আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের সুযোগ না থাকে। কোনো আয়োজন নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তা বন্ধ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। মেলায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের প্রত্যাশা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই ও চুরি প্রতিরোধ এবং মেলায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে মেলার পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কপোতাক্ষ নদের তীরের পরিবেশ রক্ষা এবং রওজা শরীফের পবিত্রতা ও মর্যাদা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য একদিনে তৈরি হয়নি। বহু প্রজন্মের মানুষের অংশগ্রহণ, আবেগ ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে বলুর মেলা আজকের অবস্থানে এসেছে। তাই সাময়িক বিনোদনের নামে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যা দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। তারা চান, এবারের মেলায় পীর বলু দেওয়ানের রওজা শরীফ, কপোতাক্ষ নদের তীর এবং স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সামনে রেখে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা হোক। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আয়োজক কমিটি ও প্রশাসনের যথাযথ তদারকিতে এবারের বলুর মেলা হবে সুন্দর, নিরাপদ, শালীন ও পরিবারবান্ধব। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলা ফিরে পাক তার নিজস্ব সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও মর্যাদা—এটাই স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।


























