০১:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাফিজুরের জালিয়াতির জালে বন্দি মনোহরপুর কারিগরি কলেজ (পর্ব-২)

Reporter Name
  • Update Time : ০১:৪০:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৬ Time View

 

​‘প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ’ সেজে নিয়োগ দিয়ে হাতিয়েছেন ২ কোটি টাকা, অভিজাত এলাকায় আলিশান বাড়ি, কলেজের জমি নিজের নামে!

​কে.এম. মোজাফ্ফর হুসাইন || অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

​মনিরামপুর (যশোর):

অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনা নির্মম সত্য! খাতা-কলমে ২০০১ সাল থেকে তিনি যশোরের চৌগাছার হাকিমপুর এলাকার এমপিওভুক্ত ‘এবিসিডি কলেজ’-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন নিয়মিত প্রভাষক। অথচ ২০০৪ সাল থেকে একই ব্যক্তি যশোরের মনিরামপুরে ‘মনোহরপুর কারিগরি ও বিজ্ঞান কলেজ’-এর ‘প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ’!

​একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে ভুয়া ‘প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ’ সেজে মো. হাফিজুর রহমান নামক এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে খাতা-কলমে নিয়োগ দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে গোপনেও নিয়োগ দিয়েছেন আরও ডজনখানেক। পকেট কমিটি গঠন, জাল-জালিয়াতি এবং ভুয়া নিয়োগ বোর্ড বসিয়ে নিয়োগ দেওয়া এই ২৮-৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একপ্রকার বিনা বেতনে বা ‘বেগার’ খাটতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের ঘাড়ে বসে জালিয়াতি ও অর্থবাণিজ্য করার পাশাপাশি কলেজের জমি নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়ে চালাচ্ছেন ধারাবাহিক প্রতারণা!
​ভুয়া পরিচয় ও ২ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য
​অনুসন্ধানে জানা যায়, হাফিজুর রহমান ২০০১ সালে চৌগাছার এবিসিডি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে মনিরামপুরে গড়ে তোলেন মনোহরপুর কারিগরি ও বিজ্ঞান কলেজ। সেই থেকে তিনি একাধারে দুই প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ সেজে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ ও নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছেন।
​২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পকেট কমিটি বানিয়ে এবং খাতা-কলমে যাবতীয় জাল-জালিয়াতি করে তিনি ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেন। প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় আনুমানিক দুই কোটি টাকা। এছাড়াও গোপনে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আরও ডজনখানেক শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিনামূল্যে খাটানো হয়েছে।

​প্রতিষ্ঠানের জমি আত্মসাৎ ও বোর্ড ফি লুটপাট
​অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমানের জালিয়াতির মাত্রা এখানেই শেষ নয়। কলেজের নিজস্ব অর্থ দিয়ে খোরশেদ গংদের কাছ থেকে কেনা জমি প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল না করে চালাকি করে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন তিনি! পরবর্তীতে সেই জমি কলেজের নামে ফেরত দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকা ও পরিচালনা পর্ষদের সাথে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
​এছাড়া ২০২০ সালে মহামারী করোনাকালে প্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষার বোর্ড ফি বাবদ আদায় করা প্রায় ৪ লাখ টাকাও তিনি পকেটে পুরেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

​রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী হুইপ ও মন্ত্রীর কথিত প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছিলেন এই ভুয়া অধ্যক্ষ। এই জালিয়াতি ও লুটপাটের টাকায় তিনি যশোর শহরের অভিজাত শংকরপুর এলাকায় ৬ শতক জমি কিনে গড়ে তুলেছেন তিনতলা বিশিষ্ট বিশাল আলিশান বাড়ি।
​এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভ, একের পর এক নানামুখী দুর্নীতির তথ্য সামনে আসলেও অজ্ঞাত কারণে এতদিন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
​
​অভিযুক্ত অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান: তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
​প্রতিষ্ঠানের সভাপতি (উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা) পুলক কুমার শিকদার: তিনি জানান, এত পুরাতন বিষয়ের বিস্তারিত আমার জানা নেই। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্রাট হোসেন: তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
​স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক: তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, দুর্নীতির বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​(আগামী পর্বে চোখ রাখুন: আসছে পর্ব ৩)

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

হাফিজুরের জালিয়াতির জালে বন্দি মনোহরপুর কারিগরি কলেজ (পর্ব-২)

Update Time : ০১:৪০:৩০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

 

​‘প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ’ সেজে নিয়োগ দিয়ে হাতিয়েছেন ২ কোটি টাকা, অভিজাত এলাকায় আলিশান বাড়ি, কলেজের জমি নিজের নামে!

​কে.এম. মোজাফ্ফর হুসাইন || অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

​মনিরামপুর (যশোর):

অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনা নির্মম সত্য! খাতা-কলমে ২০০১ সাল থেকে তিনি যশোরের চৌগাছার হাকিমপুর এলাকার এমপিওভুক্ত ‘এবিসিডি কলেজ’-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন নিয়মিত প্রভাষক। অথচ ২০০৪ সাল থেকে একই ব্যক্তি যশোরের মনিরামপুরে ‘মনোহরপুর কারিগরি ও বিজ্ঞান কলেজ’-এর ‘প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ’!

​একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে ভুয়া ‘প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ’ সেজে মো. হাফিজুর রহমান নামক এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে খাতা-কলমে নিয়োগ দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে গোপনেও নিয়োগ দিয়েছেন আরও ডজনখানেক। পকেট কমিটি গঠন, জাল-জালিয়াতি এবং ভুয়া নিয়োগ বোর্ড বসিয়ে নিয়োগ দেওয়া এই ২৮-৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একপ্রকার বিনা বেতনে বা ‘বেগার’ খাটতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের ঘাড়ে বসে জালিয়াতি ও অর্থবাণিজ্য করার পাশাপাশি কলেজের জমি নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়ে চালাচ্ছেন ধারাবাহিক প্রতারণা!
​ভুয়া পরিচয় ও ২ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য
​অনুসন্ধানে জানা যায়, হাফিজুর রহমান ২০০১ সালে চৌগাছার এবিসিডি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে মনিরামপুরে গড়ে তোলেন মনোহরপুর কারিগরি ও বিজ্ঞান কলেজ। সেই থেকে তিনি একাধারে দুই প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ সেজে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ ও নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছেন।
​২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পকেট কমিটি বানিয়ে এবং খাতা-কলমে যাবতীয় জাল-জালিয়াতি করে তিনি ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেন। প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় আনুমানিক দুই কোটি টাকা। এছাড়াও গোপনে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আরও ডজনখানেক শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিনামূল্যে খাটানো হয়েছে।

​প্রতিষ্ঠানের জমি আত্মসাৎ ও বোর্ড ফি লুটপাট
​অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমানের জালিয়াতির মাত্রা এখানেই শেষ নয়। কলেজের নিজস্ব অর্থ দিয়ে খোরশেদ গংদের কাছ থেকে কেনা জমি প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল না করে চালাকি করে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন তিনি! পরবর্তীতে সেই জমি কলেজের নামে ফেরত দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকা ও পরিচালনা পর্ষদের সাথে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
​এছাড়া ২০২০ সালে মহামারী করোনাকালে প্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষার বোর্ড ফি বাবদ আদায় করা প্রায় ৪ লাখ টাকাও তিনি পকেটে পুরেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

​রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী হুইপ ও মন্ত্রীর কথিত প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছিলেন এই ভুয়া অধ্যক্ষ। এই জালিয়াতি ও লুটপাটের টাকায় তিনি যশোর শহরের অভিজাত শংকরপুর এলাকায় ৬ শতক জমি কিনে গড়ে তুলেছেন তিনতলা বিশিষ্ট বিশাল আলিশান বাড়ি।
​এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভ, একের পর এক নানামুখী দুর্নীতির তথ্য সামনে আসলেও অজ্ঞাত কারণে এতদিন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
​
​অভিযুক্ত অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান: তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
​প্রতিষ্ঠানের সভাপতি (উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা) পুলক কুমার শিকদার: তিনি জানান, এত পুরাতন বিষয়ের বিস্তারিত আমার জানা নেই। তবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্রাট হোসেন: তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
​স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক: তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, দুর্নীতির বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​(আগামী পর্বে চোখ রাখুন: আসছে পর্ব ৩)