নাচোলের ইতিহাসঃ
- Update Time : ০৩:০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ অগাস্ট ২০২৫
- / ৩২৮ Time View

মোঃ হেলাল উদ্দীন, নাচোল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলা। ঐতিহাসিক এই উপজেলার সাথে জড়িয়ে আছে তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস।নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলামিত্রের নেতৃত্বে এখানকার কৃষকরা তাদের দাবী আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। এ অঞ্চলের মানুষ নিজেদের অধিকার ও দাবী আদায়ে কখনো আপোষ করেনি বরং সংগ্রামের মাধ্যমে আদায় করেছেন। অতীতের মতো বর্তমানেরও নাচোল একটি স্বাধীনচেতা অঞ্চল । এই উপজেলার প্রতিটি জনপদে রয়েছে আলাদা আলাদা নিজস্বতা। পাশাপাশি এখানকার আঞ্চলিক সংস্কৃতি নাচোল উপজেলাকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দেশের যে কোন স্থানের থেকে আলাদা ও ব্যতিক্রম করেছে। প্রশাসনিক এবং অবস্থানগত দিক থেকেও এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। প্রায় ৪৬% স্বাক্ষরতার হার নিয়ে এখানকার মানুষ জানান দিচ্ছে। শিক্ষা-দিক্ষাতেও পিছিয়ে নাই তারা। নাচোল সরকারী কলেজ, নাচোল মহিলা কলেজ, এশিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ এবং নাচোল উচ্চবিদ্যালয় এখানে উল্লেখ্যযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে এই উপজেলায় রয়েছে ছয়টি কলেজ, তিনটি কারিগরি কলেজ, ৩৪ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আঠারোটি মাদ্রাসা। উজিরপুর দরগা, নাচোল বাজার মন্দির এবং দেওপাড়া মঠের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখানকার ইতিহাসকে ধারণ করে আছে। নাচোলে বিভিন্ন ধর্মের এবং গোত্রের মানুষ বসবাস করছে। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের আন্তরিকতা এবং সৌহাদ্যপূর্ণ আচরণ এ অঞ্চলের সুনাম সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে। ৩ অক্ষরের ছোট একটি নাম ‘নাচোল‘ । কিন্তু এই নামের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস আজো জানা যায়নি। তবে জনশ্রুতি আছে, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিসের চীরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় এ এলাকার নামকরণ হয়েছিল। ধারণাটি আরো স্পষ্ট হয় ১৮১৩ সালে যখন মালদহ জেলা গঠিত হয়েছিল। মালদহের তৎকালীন থানার তালিকায় নাচোলের অন্তর্ভুক্তি ছিল এ ধারনার প্রধান কারণ। এছাড়া ‘মালদহ জেলার ইতিকথা‘ গ্রন্থে নাচোল নামকরণের কিছু তথ্য আছে। জানা যায়, হিন্দু ও আদিবাসী সাঁওতাল অধ্যুষিত এ এলাকায় প্রায়ই নাচের আসর হতো। মনোরঞ্জন বা চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যে এলাকার জমিদাররা এসব নাচের আসরের আয়োজন করতো। আর এই নাচে অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন গ্রাম থেকে দল বেঁধে ছুটে আসতেন সাঁওতাল রমনীরা। তখন ‘নাচে চল‘ শব্দ থেকেই অশিক্ষিত বা অদক্ষ উচ্চারণে প্রথমে ‘নাচচল‘ এবং পরে বিবর্তিত আকারে নাচোল নামের উৎপত্তি হয়। অতীতে যে এখানে আসলেই জমিদারদের বসবাস ছিল, তা প্রমাণিত হয় বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণের মাধ্যমে। ‘কলিহার জমিদার বাড়ি‘ এবং মল্লিকপুর জমিদার বাড়ি এগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া রয়েছে ফতেহপুরের আলী শাহপুর জামে মসজিদ, এলাইপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। ১৯১৮ সালে নাচোল থানা গঠিত হওয়ার মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ প্রাশাসনিক কাঠামোর আওতায় আসে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ১৩ বছর পর ১৯৮৪ সালে নাচোল থানাকে উপজেলায় রুপান্তরিত করা হয়। ১টি পৌরসভা, ৪টি ইউনিয়ন, ১৬৭টি মৌজা এবং ১৯১ টি গ্রাম নিয়ে এ উপজেলার বর্তমান আয়তন২৮৩ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক দিক থেকে নাচোলের উত্তর-পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর, দক্ষিণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, পূর্বে রাজশাহীর তানোর এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার অবস্থান। মহানন্দা নদীবিধৌত এ উপজেলার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। নাচোলের মাটি ধান উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। ধান ছাড়াও গম, ডাল এবং বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি উৎপাদনে খ্যাতি আছে এখানকার কৃষকদের। অর্থনীতির মতোই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। নাগরিকরা তাদের মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে আগের তুলনায় অনেক সচেতন। সব মিলিয়ে একটি আদর্শ জনপদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নাচোল উপজেলা।











