০২:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসা নয়, গাফিলতির চিত্র বহন করছে সোহরাওয়ার্দী কলেজের মেডিকেল সেন্টার

Reporter Name
  • Update Time : ১১:৪১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
  • / ১৮৬ Time View

 

রুমা আক্তার ; সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রতিনিধি

 

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের মেডিকেল সেন্টার বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত এই স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের কার্য আজ অকেজো হয়ে পড়েছে।

কলেজে প্রতিদিন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও চিকিৎসা সেবার পরিসর অত্যন্ত সীমিত। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে মেডিকেল সেন্টারে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ তো দূরের কথা— একমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ‘নাপা’ ছাড়া আর কোন ওষুধ নিয়মিত পাওয়া যায় না। ওষুধ ছাড়াও চিকিৎসা সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে সোহরাওয়ার্দী কলেজ মেডিকেল সেন্টারে।

সেন্টারের ভেতরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। জরাজীর্ণ একটি বেড, মেয়াদ উত্তীর্ণ অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভাঙ্গা জানালা, সব মিলিয়ে নেই কোন পরিপাটির ছোঁয়া, নেই কোন আধুনিক চিকিৎসা সামগ্রী। যেনো সুস্থ মানুষ ভেতরে ঢুকলেও অসুস্থ হয়ে যাবে।

শিক্ষার্থীদের একাংশ জানায়, অসুস্থ হয়ে মেডিকেল সেন্টারে গেলেও প্রায়ই ডাক্তারকে পাওয়া যায় না। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ বা সরঞ্জামের অভাবে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এ এক বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. কানিজ ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি জানান, “আমি গত এক বছর ধরে এই মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বে রয়েছি। শুরু থেকেই আমি কলেজ প্রশাসনকে বারবার বলেছি এই সমস্যাগুলোর কথা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজ পর্যন্ত তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”

তবে নিজের দিক থেকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমাদের কাছে  নাপা ছাড়াও রয়েছে সেলাইন, ইবুপ্রোফেন,এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে  ব্যান্ডেজ, কটন, সিজার ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আমি রবি,  মঙ্গল ও বৃহস্পতি সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত সেন্টারে উপস্থিত থাকি এবং এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার।”

সোহরাওয়ার্দী কলেজের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবার এমন করুণ অবস্থা নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। বিষয়টি এখনই আমলে না নিলে ভবিষ্যতে আরও গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

যখন ডা. কানিজ ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মেডিকেল সেন্টারের এই বেহাল দশার জন্য কাদের গাফলতি রয়েছে। যারা দায়িত্বে রয়েছে তারা নাকি প্রশাসনের —তাঁর সোজাসাপটা উত্তর, “উন্নয়ন কাজ করা আমাদের দায়িত্ব নয়, সেটা প্রশাসনের। আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্ঠা করছি। তবে সত্যি কথা হলো—এই মেডিকেলের অবস্থা খুবই খারাপ। বিশেষ করে গরমে এখানে বসা যায় না। দেখা গেলো পরীক্ষা চলাকালীন কয়েকজন শিক্ষার্থী হিটস্ট্রোক করে সেন্টারে এসেছিল। কিন্তু বসার মতো ঠান্ডা কোন জায়গায় নেই সেন্টারে। এতে করে তারা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। অথচ এসব সমস্যা নিয়ে প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে অনেক আগেই ।

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা থাকা উচিত শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে। অথচ সোহরাওয়ার্দী কলেজের মেডিকেল সেন্টারের বর্তমান চিত্র ভিন্ন। যেখানে শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে অবহেলা, গাফিলতি আর উদাসীনতা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। এখন সময়, প্রশাসন যেন এই নীরবতাকে ভাঙে, দায়িত্ব নেয়, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

চিকিৎসা নয়, গাফিলতির চিত্র বহন করছে সোহরাওয়ার্দী কলেজের মেডিকেল সেন্টার

Update Time : ১১:৪১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫

 

রুমা আক্তার ; সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রতিনিধি

 

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের মেডিকেল সেন্টার বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত এই স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের কার্য আজ অকেজো হয়ে পড়েছে।

কলেজে প্রতিদিন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও চিকিৎসা সেবার পরিসর অত্যন্ত সীমিত। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে মেডিকেল সেন্টারে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ তো দূরের কথা— একমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ‘নাপা’ ছাড়া আর কোন ওষুধ নিয়মিত পাওয়া যায় না। ওষুধ ছাড়াও চিকিৎসা সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে সোহরাওয়ার্দী কলেজ মেডিকেল সেন্টারে।

সেন্টারের ভেতরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। জরাজীর্ণ একটি বেড, মেয়াদ উত্তীর্ণ অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভাঙ্গা জানালা, সব মিলিয়ে নেই কোন পরিপাটির ছোঁয়া, নেই কোন আধুনিক চিকিৎসা সামগ্রী। যেনো সুস্থ মানুষ ভেতরে ঢুকলেও অসুস্থ হয়ে যাবে।

শিক্ষার্থীদের একাংশ জানায়, অসুস্থ হয়ে মেডিকেল সেন্টারে গেলেও প্রায়ই ডাক্তারকে পাওয়া যায় না। অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ বা সরঞ্জামের অভাবে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য এ এক বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. কানিজ ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি জানান, “আমি গত এক বছর ধরে এই মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বে রয়েছি। শুরু থেকেই আমি কলেজ প্রশাসনকে বারবার বলেছি এই সমস্যাগুলোর কথা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজ পর্যন্ত তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”

তবে নিজের দিক থেকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমাদের কাছে  নাপা ছাড়াও রয়েছে সেলাইন, ইবুপ্রোফেন,এবং চিকিৎসা যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে  ব্যান্ডেজ, কটন, সিজার ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আমি রবি,  মঙ্গল ও বৃহস্পতি সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত সেন্টারে উপস্থিত থাকি এবং এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার।”

সোহরাওয়ার্দী কলেজের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবার এমন করুণ অবস্থা নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। বিষয়টি এখনই আমলে না নিলে ভবিষ্যতে আরও গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

যখন ডা. কানিজ ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মেডিকেল সেন্টারের এই বেহাল দশার জন্য কাদের গাফলতি রয়েছে। যারা দায়িত্বে রয়েছে তারা নাকি প্রশাসনের —তাঁর সোজাসাপটা উত্তর, “উন্নয়ন কাজ করা আমাদের দায়িত্ব নয়, সেটা প্রশাসনের। আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্ঠা করছি। তবে সত্যি কথা হলো—এই মেডিকেলের অবস্থা খুবই খারাপ। বিশেষ করে গরমে এখানে বসা যায় না। দেখা গেলো পরীক্ষা চলাকালীন কয়েকজন শিক্ষার্থী হিটস্ট্রোক করে সেন্টারে এসেছিল। কিন্তু বসার মতো ঠান্ডা কোন জায়গায় নেই সেন্টারে। এতে করে তারা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। অথচ এসব সমস্যা নিয়ে প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে অনেক আগেই ।

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা থাকা উচিত শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে। অথচ সোহরাওয়ার্দী কলেজের মেডিকেল সেন্টারের বর্তমান চিত্র ভিন্ন। যেখানে শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে অবহেলা, গাফিলতি আর উদাসীনতা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। এখন সময়, প্রশাসন যেন এই নীরবতাকে ভাঙে, দায়িত্ব নেয়, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে।