১১:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চাপে ভেঙে পড়ল দুই কোটি টাকার সেতু

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:০৯:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • / ৭৬ Time View

 

রিয়াদ ইসলাম আমতলী বরগুনা

বরগুনার আমতলী উপজেলায় চাওড়া নদীর উপর নির্মিত আয়রন সেতু ১৮ বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চাপে। এতে আমতলীর চাওড়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, সেতুটি নির্মাণকালে অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে এটি ভেঙে পড়েছে।

সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে আমতলী উপজেলার চন্দ্রা আউয়াল নগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইদ্রিস আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

জানা গেছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উদ্যোগে চাওড়া নদীর ওপর প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে এই আয়রন সেতু নির্মাণ করা হয়। ওই সময় দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পান হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি শহীদুল ইসলাম মৃধা।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেন, যার ফলে নির্মাণের পাঁচ বছরের মধ্যেই সেতুর মাঝের ভিম নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ১৩ বছর ধরে স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছিলেন।

সোমবার রাতে একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা দুইজন যাত্রী নিয়ে সেতু পার হওয়ার সময় সেটির দুই-তৃতীয়াংশ অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। তবে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে অটোরিকশা ও যাত্রীদের নিরাপদে তীরে নিয়ে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছেন, সেতুটি নির্মাণকালে ঠিকাদারের গাফিলতির কারণেই এটি অল্প সময়ের মধ্যে ধসে পড়েছে।

এ বিষয়ে নাশির হাওলাদার বলেন, “সেতুটি নির্মাণের সময় থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ছিল। কয়েকবার মেরামত করেও কোনো লাভ হয়নি। এখন মাত্র ১৮ বছরের মাথায় এটি পুরোপুরি ধসে গেল। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।”

স্থানীয় দুলাল প্যাদা ও জালাল মীর বলেন, “সেতু ভেঙে পড়ায় দুই ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষের চলাচলে মারাত্মক অসুবিধা হবে। দ্রুত এখানে একটি গার্ডার সেতু নির্মাণের দাবি জানাই।”

আহত যাত্রী মিরাজ সিপাহী বলেন, “গাড়িটি সেতুর মাঝ বরাবর যেতেই সেটি ভেঙে নদীতে পড়ে যাই, তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি।”

ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম মৃধার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, তিনি গত ৫ আগস্ট থেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন এবং তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।

আমতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইদ্রিস আলী জানান, “সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং গাড়ি পারাপারে সতর্কীকরণ নোটিশ ও পিলার গেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবুও স্থানীয়রা গাড়ি নিয়ে সেতুতে ওঠায় এটি ধসে পড়ে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বরগুনা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, “সেতুটি নির্মাণের সময়েই নিম্নমানের কাজ করা হয়েছিল, যার কারণে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গত বছর সেতুটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সতর্কীকরণ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা উপেক্ষা করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবুও তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২২ জুন একই ঠিকাদারের নির্মিত হলদিয়াহাট সেতুও ভেঙে পড়ে। ওই সময় বরযাত্রী বহনকারী একটি মাইক্রোবাস নদীতে পড়ে যায়, যার ফলে ১০ জন নিহত হন। কিন্তু তখনও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ বা প্রশাসন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এবার একই ধরনের অনিয়মের কারণে চন্দ্রা আউয়ালনগর সেতু ধসে পড়ল, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকেও স্পষ্ট করে তুলেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে টেকসই সেতু নির্মাণ করতে হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চাপে ভেঙে পড়ল দুই কোটি টাকার সেতু

Update Time : ০৮:০৯:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

 

রিয়াদ ইসলাম আমতলী বরগুনা

বরগুনার আমতলী উপজেলায় চাওড়া নদীর উপর নির্মিত আয়রন সেতু ১৮ বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চাপে। এতে আমতলীর চাওড়া ও হলদিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, সেতুটি নির্মাণকালে অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে এটি ভেঙে পড়েছে।

সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে আমতলী উপজেলার চন্দ্রা আউয়াল নগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইদ্রিস আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

জানা গেছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উদ্যোগে চাওড়া নদীর ওপর প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে এই আয়রন সেতু নির্মাণ করা হয়। ওই সময় দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পান হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি শহীদুল ইসলাম মৃধা।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেন, যার ফলে নির্মাণের পাঁচ বছরের মধ্যেই সেতুর মাঝের ভিম নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ১৩ বছর ধরে স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছিলেন।

সোমবার রাতে একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা দুইজন যাত্রী নিয়ে সেতু পার হওয়ার সময় সেটির দুই-তৃতীয়াংশ অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। তবে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে অটোরিকশা ও যাত্রীদের নিরাপদে তীরে নিয়ে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছেন, সেতুটি নির্মাণকালে ঠিকাদারের গাফিলতির কারণেই এটি অল্প সময়ের মধ্যে ধসে পড়েছে।

এ বিষয়ে নাশির হাওলাদার বলেন, “সেতুটি নির্মাণের সময় থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ছিল। কয়েকবার মেরামত করেও কোনো লাভ হয়নি। এখন মাত্র ১৮ বছরের মাথায় এটি পুরোপুরি ধসে গেল। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।”

স্থানীয় দুলাল প্যাদা ও জালাল মীর বলেন, “সেতু ভেঙে পড়ায় দুই ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষের চলাচলে মারাত্মক অসুবিধা হবে। দ্রুত এখানে একটি গার্ডার সেতু নির্মাণের দাবি জানাই।”

আহত যাত্রী মিরাজ সিপাহী বলেন, “গাড়িটি সেতুর মাঝ বরাবর যেতেই সেটি ভেঙে নদীতে পড়ে যাই, তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি।”

ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম মৃধার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, তিনি গত ৫ আগস্ট থেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন এবং তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।

আমতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইদ্রিস আলী জানান, “সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং গাড়ি পারাপারে সতর্কীকরণ নোটিশ ও পিলার গেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবুও স্থানীয়রা গাড়ি নিয়ে সেতুতে ওঠায় এটি ধসে পড়ে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বরগুনা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, “সেতুটি নির্মাণের সময়েই নিম্নমানের কাজ করা হয়েছিল, যার কারণে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গত বছর সেতুটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সতর্কীকরণ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা উপেক্ষা করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবুও তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২২ জুন একই ঠিকাদারের নির্মিত হলদিয়াহাট সেতুও ভেঙে পড়ে। ওই সময় বরযাত্রী বহনকারী একটি মাইক্রোবাস নদীতে পড়ে যায়, যার ফলে ১০ জন নিহত হন। কিন্তু তখনও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ বা প্রশাসন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এবার একই ধরনের অনিয়মের কারণে চন্দ্রা আউয়ালনগর সেতু ধসে পড়ল, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকেও স্পষ্ট করে তুলেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে টেকসই সেতু নির্মাণ করতে হবে।