০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাছ বিক্রেতা থেকে আরবী প্রভাষক।

Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
  • / ২৬২ Time View

 

মোবারক হোসাইন
ঈদগাঁও উপজেলা।

কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলা
জালালাবাদ ইউনিয়নে
দক্ষিণ পালাকাটা পরিবারের -মাছের ব্যবসার হাল ধরে জীবিকার তাগিদে পথ চলা সেই সংগ্রামী ছেলেটা আজ আরবী প্রভাষক❞ অদম্য-মায়ের গল্প
জীবন কখনো সোনার চামচ নিয়ে জন্ম দেয় না সবাইকে।
কারও জীবনের শুরুটা হয় কাঁচা মাটির ঘরে, খালি পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার গল্প দিয়ে।
তেমনই একজন—আব্দুল্লাহ আল হোসাইন ।

ঈদগাঁও উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ পালাকাটা গ্রামে এক নিঃশব্দ ভোরে, কুয়াশার চাঁদরে ঢাকা গ্রামে তার বেড়ে ওঠা।
মা ছিলেন একজন মাছ ব্যবসায়ী।বাবা থেকেও নেই।
ঘর ভরা ছিল আর্থিক টানাপোড়েন, কিন্তু অভাব কোনোদিন দমিয়ে রাখতে পারেনি এই ছেলেটাকে।

ছোট্ট বয়সেই মায়ের হাত ধরে চলে যেত বাজারে মাছ বিক্রি করতে।
যেখানে অন্যরা খেলত, শিখত অ আ ক খ,
সেখানে আব্দুল্লাহর হাতে থাকত মাছের ঝুড়ি।
তবু সে বই ছাড়েনি।
বাজারে বসেই বই খুলে পড়তে থাকত—এক কোণে দাঁড়িয়ে।
অভাব তাকে বই থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি, পারেনি তার চোখের স্বপ্নটাকে মুছে ফেলতে।

পড়াশোনা করত ফাঁকে ফাঁকে—
অসংখ্য বাধা পেরিয়ে, ঘরে ঘরে গিয়ে টিউশনি করে চালিয়ে গেছে নিজের পড়াশোনা।
পড়াশোনায় ভালো ছিলো বলে এলাকার মানুষেরা তাকেঁ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

তার শিক্ষার আলোটা জ্বলে উঠেছিল একেবারে ছোটবেলা থেকেই—
খোনকারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছিল সেই পথচলা।

২০১০ সালে পালাকাটা গোলজারিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অর্জন করেন জিপিএ ৫—
যেন পুরো গ্রামে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল সেদিন।
সেই ধারা বজায় রেখেই ২০১২ সালে তমিজিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষাতেও ছিনিয়ে আনেন জিপিএ ৫।

এটা কোনো সহজ কৃতিত্ব ছিল না।
এই অর্জনের পেছনে ছিল লুকানো শত রাতের জেগে থাকা,
ছিল ক্ষুধা নিয়ে পড়া, অশ্রু গোপন করে হাসা।
এই সাফল্য কাকতালীয় নয়—
এ এক নিরব, নিঃশব্দ যুদ্ধের গর্বিত বিজয়।
একজন যোদ্ধার গল্প—যিনি কলমকে অস্ত্র বানিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে অনার্স আর মাস্টার্স—দুটোতেই প্রথম শ্রেণি।
এই তো সেই ছেলে, যে মাছের গন্ধ মাখা আঙুলে একদিন স্বপ্ন লিখে রাখত।
আজ সেই হাতেই ধরা দেয় অর্জনের কলম।

তার শিক্ষাজীবনের পথচলা থেমে থাকেনি বিশ্ববিদ্যালয়েই।
জ্ঞানতৃষ্ণা তাকে নিয়ে গেছে দ্বীনি শিক্ষার গভীর স্রোতে।
ফাজিল সম্পন্ন করেছেন ঐতিহ্যবাহী জামেয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে—
যেখানে কেবল বই নয়, মানুষ গড়ে তোলার পাঠও শেখানো হয়।

আর কামিল করেছেন হাদিস বিভাগে, গহিরার প্রখ্যাত জামেউল উলুম মাদ্রাসা থেকে—
যেখানে প্রতিটি হাদিসের শব্দে, প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি খুঁজেছেন আলোর পথ।

এই অর্জনগুলো কোনো সুযোগের উপহার নয়,
এসেছে আত্মত্যাগের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে,
ধৈর্যের দীর্ঘশ্বাসে গড়া সিঁড়ি বেয়ে,
আর নিরলস পরিশ্রমের প্রতিটি ফোঁটা ঘামে ভিজে।

শিক্ষকতা জীবনের শুরুটা ছিল ২০১৭ সালে, মুহিউসসুন্নাহ মাদ্রাসায় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে।
এরপর তানজিমুল মিল্লাতে কাটিয়েছেন মূল্যবান সময়।
আজ তিনি নাঙ্গলমোড়া শামছুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসার হাটহাজারী চট্টগ্রামের এই প্রতিষ্ঠানে আরবি প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ আছেন
ছাত্ররা তাকে শুধু ‘স্যার’ বলে না—ডাকে ‘অনুপ্রেরণা’ বলে।
বর্তমানে তিনি একজন নতুন আলোচকও।বিভিন্ন জায়গায় তাফসির মাহফিল করেন তিনি।

এই মানুষটি আমাদের শেখান,
অভাব মানেই থেমে যাওয়া নয়।
শুধু সাহস লাগে, নিজের উপর বিশ্বাস লাগে।
তবেই একদিন আলো আসে—কষ্টের ঠিক পাশেই।

আব্দুল্লাহ আমাদের শেখান—জীবন যতই কঠিন হোক,
যদি ইচ্ছা থাকে, যদি মন থেকে কেউ বলে ‘আমি পারবো’,
তবে আলোর পথ ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়।

আলো আসবেই… শুধু হার না মানলে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

মাছ বিক্রেতা থেকে আরবী প্রভাষক।

Update Time : ০৭:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫

 

মোবারক হোসাইন
ঈদগাঁও উপজেলা।

কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলা
জালালাবাদ ইউনিয়নে
দক্ষিণ পালাকাটা পরিবারের -মাছের ব্যবসার হাল ধরে জীবিকার তাগিদে পথ চলা সেই সংগ্রামী ছেলেটা আজ আরবী প্রভাষক❞ অদম্য-মায়ের গল্প
জীবন কখনো সোনার চামচ নিয়ে জন্ম দেয় না সবাইকে।
কারও জীবনের শুরুটা হয় কাঁচা মাটির ঘরে, খালি পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার গল্প দিয়ে।
তেমনই একজন—আব্দুল্লাহ আল হোসাইন ।

ঈদগাঁও উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ পালাকাটা গ্রামে এক নিঃশব্দ ভোরে, কুয়াশার চাঁদরে ঢাকা গ্রামে তার বেড়ে ওঠা।
মা ছিলেন একজন মাছ ব্যবসায়ী।বাবা থেকেও নেই।
ঘর ভরা ছিল আর্থিক টানাপোড়েন, কিন্তু অভাব কোনোদিন দমিয়ে রাখতে পারেনি এই ছেলেটাকে।

ছোট্ট বয়সেই মায়ের হাত ধরে চলে যেত বাজারে মাছ বিক্রি করতে।
যেখানে অন্যরা খেলত, শিখত অ আ ক খ,
সেখানে আব্দুল্লাহর হাতে থাকত মাছের ঝুড়ি।
তবু সে বই ছাড়েনি।
বাজারে বসেই বই খুলে পড়তে থাকত—এক কোণে দাঁড়িয়ে।
অভাব তাকে বই থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি, পারেনি তার চোখের স্বপ্নটাকে মুছে ফেলতে।

পড়াশোনা করত ফাঁকে ফাঁকে—
অসংখ্য বাধা পেরিয়ে, ঘরে ঘরে গিয়ে টিউশনি করে চালিয়ে গেছে নিজের পড়াশোনা।
পড়াশোনায় ভালো ছিলো বলে এলাকার মানুষেরা তাকেঁ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

তার শিক্ষার আলোটা জ্বলে উঠেছিল একেবারে ছোটবেলা থেকেই—
খোনকারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছিল সেই পথচলা।

২০১০ সালে পালাকাটা গোলজারিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অর্জন করেন জিপিএ ৫—
যেন পুরো গ্রামে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল সেদিন।
সেই ধারা বজায় রেখেই ২০১২ সালে তমিজিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষাতেও ছিনিয়ে আনেন জিপিএ ৫।

এটা কোনো সহজ কৃতিত্ব ছিল না।
এই অর্জনের পেছনে ছিল লুকানো শত রাতের জেগে থাকা,
ছিল ক্ষুধা নিয়ে পড়া, অশ্রু গোপন করে হাসা।
এই সাফল্য কাকতালীয় নয়—
এ এক নিরব, নিঃশব্দ যুদ্ধের গর্বিত বিজয়।
একজন যোদ্ধার গল্প—যিনি কলমকে অস্ত্র বানিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে অনার্স আর মাস্টার্স—দুটোতেই প্রথম শ্রেণি।
এই তো সেই ছেলে, যে মাছের গন্ধ মাখা আঙুলে একদিন স্বপ্ন লিখে রাখত।
আজ সেই হাতেই ধরা দেয় অর্জনের কলম।

তার শিক্ষাজীবনের পথচলা থেমে থাকেনি বিশ্ববিদ্যালয়েই।
জ্ঞানতৃষ্ণা তাকে নিয়ে গেছে দ্বীনি শিক্ষার গভীর স্রোতে।
ফাজিল সম্পন্ন করেছেন ঐতিহ্যবাহী জামেয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে—
যেখানে কেবল বই নয়, মানুষ গড়ে তোলার পাঠও শেখানো হয়।

আর কামিল করেছেন হাদিস বিভাগে, গহিরার প্রখ্যাত জামেউল উলুম মাদ্রাসা থেকে—
যেখানে প্রতিটি হাদিসের শব্দে, প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি খুঁজেছেন আলোর পথ।

এই অর্জনগুলো কোনো সুযোগের উপহার নয়,
এসেছে আত্মত্যাগের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে,
ধৈর্যের দীর্ঘশ্বাসে গড়া সিঁড়ি বেয়ে,
আর নিরলস পরিশ্রমের প্রতিটি ফোঁটা ঘামে ভিজে।

শিক্ষকতা জীবনের শুরুটা ছিল ২০১৭ সালে, মুহিউসসুন্নাহ মাদ্রাসায় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে।
এরপর তানজিমুল মিল্লাতে কাটিয়েছেন মূল্যবান সময়।
আজ তিনি নাঙ্গলমোড়া শামছুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসার হাটহাজারী চট্টগ্রামের এই প্রতিষ্ঠানে আরবি প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ আছেন
ছাত্ররা তাকে শুধু ‘স্যার’ বলে না—ডাকে ‘অনুপ্রেরণা’ বলে।
বর্তমানে তিনি একজন নতুন আলোচকও।বিভিন্ন জায়গায় তাফসির মাহফিল করেন তিনি।

এই মানুষটি আমাদের শেখান,
অভাব মানেই থেমে যাওয়া নয়।
শুধু সাহস লাগে, নিজের উপর বিশ্বাস লাগে।
তবেই একদিন আলো আসে—কষ্টের ঠিক পাশেই।

আব্দুল্লাহ আমাদের শেখান—জীবন যতই কঠিন হোক,
যদি ইচ্ছা থাকে, যদি মন থেকে কেউ বলে ‘আমি পারবো’,
তবে আলোর পথ ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়।

আলো আসবেই… শুধু হার না মানলে।