০১:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কটিয়াদীর ফেকামারা মাদ্রাসায় দাখিল ফলে ভরাডুবি: ক্লাসে অনুপস্থিতি ও অব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্য হুমকিতে

Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৫:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৯ Time View

 

এ.এস.এম হামিদ হাসান
​কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধি:

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ফেকামারা কামিল মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গৌরবময় দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও ঐতিহ্য এখন তীব্র সংকটের মুখে।

বিগত বছরগুলোতে সাবেক শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম ও নিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ালেও, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফল সব অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​মাদ্রাসার প্রশাসনিক তথ্য ও প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৯০.২৪ শতাংশ, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক ২৪.৩৯ শতাংশে। চলতি বছর ৪২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পেরেছে মাত্র ১০ জন। এমন বিপর্যয়কর ফলাফলে চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।

ফলাফল ধসের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পরীক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তনকে অন্যতম প্রধান কারণ বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, নতুন কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি শিক্ষার্থীদের ছিল না। পাশাপাশি পুরো ব্যাচের দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট, দুইজন শিক্ষকের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়াকে দায়ী করেন তিনি। দারিদ্র্যের কারণে দুপুরে টিফিন না পেয়ে বিরতির সময় অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি চলে যায় বলেও জানান তিনি।

​তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র। বেলা ৩টার দিকে শিক্ষকদের সামনেই বহু শিক্ষার্থীকে ব্যাগ নিয়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করতে দেখা যায়, অথচ উপস্থিত শিক্ষকরা তাদের থামাতে কোনো উদ্যোগ নেননি। পুরো মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষগুলো তখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীশূন্য। অন্যদিকে, শিক্ষকমণ্ডলীর একটি বড় অংশকে শিক্ষক মিলনায়তনে আড্ডায় মগ্ন থাকতে দেখা যায়।

উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, “ছাত্ররা চলে গেছে, তাই ক্লাস হচ্ছে না।”
​একই সময়ে ৩ জন শিক্ষকের একযোগে ছুটিতে থাকা এবং বাকিদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা নিয়েও নিয়মকানুন পালনের প্রশ্ন উঠেছে।
​গ্রুপিং,কোন্দল ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কিছু শিক্ষকের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ এই দুরবস্থা। শিক্ষকরা নিজেদের কোন্দল ও আড্ডায় ব্যস্ত থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা পরিবেশ।

​ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। তবে অভিভাবকরা কেবল নোটিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

​ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটিকে আগের গৌরবে ফেরাতে সচেতন মহল ও স্থানীয় বাসিন্দারা ৭টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছেন: ​২০২৬ সালের দাখিল ফলাফলের পেছনে আসল কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন। ​শিক্ষকদের ক্লাসে উপস্থিতি ও মানসম্মত পাঠদান বাধ্যতামূলক করা। ​শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি প্রতিরোধে নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
​বিধিমোতাবেক শিক্ষক ছুটি অনুমোদিত হয়েছে কি না তা যাচাই করা। ​প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনীতি ও গ্রুপিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
​পরিচালনা কমিটিকে আরো সক্রিয় ও শিক্ষাবান্ধব করা। ​রাজনৈতিক প্রভাবে দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ বন্ধ করা। ​ভবন চকচকে হলেও শ্রেণিকক্ষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীশূন্য থাকলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। কটিয়াদীর গর্ব ফেকামারা কামিল মাদ্রাসার ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই প্রয়োজন কঠোর ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষক-প্রশাসনের পূর্ণ জবাবদিহিতা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

কটিয়াদীর ফেকামারা মাদ্রাসায় দাখিল ফলে ভরাডুবি: ক্লাসে অনুপস্থিতি ও অব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্য হুমকিতে

Update Time : ১১:২৫:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

 

এ.এস.এম হামিদ হাসান
​কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধি:

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ফেকামারা কামিল মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গৌরবময় দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও ঐতিহ্য এখন তীব্র সংকটের মুখে।

বিগত বছরগুলোতে সাবেক শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম ও নিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ালেও, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফল সব অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​মাদ্রাসার প্রশাসনিক তথ্য ও প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৯০.২৪ শতাংশ, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক ২৪.৩৯ শতাংশে। চলতি বছর ৪২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পেরেছে মাত্র ১০ জন। এমন বিপর্যয়কর ফলাফলে চরম ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।

ফলাফল ধসের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পরীক্ষার কেন্দ্র পরিবর্তনকে অন্যতম প্রধান কারণ বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, নতুন কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি শিক্ষার্থীদের ছিল না। পাশাপাশি পুরো ব্যাচের দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট, দুইজন শিক্ষকের মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়াকে দায়ী করেন তিনি। দারিদ্র্যের কারণে দুপুরে টিফিন না পেয়ে বিরতির সময় অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি চলে যায় বলেও জানান তিনি।

​তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র। বেলা ৩টার দিকে শিক্ষকদের সামনেই বহু শিক্ষার্থীকে ব্যাগ নিয়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করতে দেখা যায়, অথচ উপস্থিত শিক্ষকরা তাদের থামাতে কোনো উদ্যোগ নেননি। পুরো মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষগুলো তখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীশূন্য। অন্যদিকে, শিক্ষকমণ্ডলীর একটি বড় অংশকে শিক্ষক মিলনায়তনে আড্ডায় মগ্ন থাকতে দেখা যায়।

উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, “ছাত্ররা চলে গেছে, তাই ক্লাস হচ্ছে না।”
​একই সময়ে ৩ জন শিক্ষকের একযোগে ছুটিতে থাকা এবং বাকিদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকা নিয়েও নিয়মকানুন পালনের প্রশ্ন উঠেছে।
​গ্রুপিং,কোন্দল ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কিছু শিক্ষকের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ এই দুরবস্থা। শিক্ষকরা নিজেদের কোন্দল ও আড্ডায় ব্যস্ত থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা পরিবেশ।

​ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। তবে অভিভাবকরা কেবল নোটিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

​ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটিকে আগের গৌরবে ফেরাতে সচেতন মহল ও স্থানীয় বাসিন্দারা ৭টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছেন: ​২০২৬ সালের দাখিল ফলাফলের পেছনে আসল কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন। ​শিক্ষকদের ক্লাসে উপস্থিতি ও মানসম্মত পাঠদান বাধ্যতামূলক করা। ​শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি প্রতিরোধে নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
​বিধিমোতাবেক শিক্ষক ছুটি অনুমোদিত হয়েছে কি না তা যাচাই করা। ​প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনীতি ও গ্রুপিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
​পরিচালনা কমিটিকে আরো সক্রিয় ও শিক্ষাবান্ধব করা। ​রাজনৈতিক প্রভাবে দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ বন্ধ করা। ​ভবন চকচকে হলেও শ্রেণিকক্ষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীশূন্য থাকলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। কটিয়াদীর গর্ব ফেকামারা কামিল মাদ্রাসার ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই প্রয়োজন কঠোর ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষক-প্রশাসনের পূর্ণ জবাবদিহিতা।