কক্সবাজার বিমান বাহিনীর নির্যাতন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা: এক তীব্র প্রতিবাদ
- Update Time : ০৮:৪০:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / ১১৩ Time View

রেজাউল করিম, সদর উপজেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজারে বিমান বাহিনীর নির্যাতন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা: এক তীব্র প্রতিবাদ
সম্প্রতি কক্সবাজারের সমিতি পাড়া ও কুতুবদিয়া পাড়ায় বিমান বাহিনীর হাতে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত যুবকের নাম শিহাব, যিনি কক্সবাজারের সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নাসির উদ্দীনের সন্তান। তার মৃত্যু শুধু পরিবার নয়, গোটা কক্সবাজারকে শোকাহত করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই কক্সবাজারের জনগণ ও গণমাধ্যমের মধ্যে যে বিশাল ফারাক সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও সুশাসনের প্রতি গভীর প্রশ্ন তুলছে।
বাসিন্দাদের জীবনের সঙ্গে খেলা: আড়ালে থাকা বাস্তবতা
কক্সবাজারের সমিতি পাড়া ও কুতুবদিয়া পাড়া প্রায় ৫০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। বেশ কিছু বছর ধরে এখানে বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা ছিল। কিন্তু বিমান বাহিনীর ঘাঁটি নির্মাণের পর থেকেই স্থানীয়দের জীবন অসম্ভব হয়ে ওঠে। প্রায় বিশ বছর আগে সরকারের পক্ষ থেকে বিমান বাহিনীর জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং এরপর তাদের ঘাঁটির সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু একের পর এক উচ্ছেদের প্রক্রিয়া এবং ভিটে-বাড়ির বন্দোবস্তের অভাবে এখানে বাস করা মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিমান বাহিনী তাদের ঘাঁটি সম্প্রসারণ করতে চাইলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিকল্প জায়গা দেয়নি, বরং ধীরে ধীরে তাদের প্রতি দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। বহু বছর ধরে স্থানীয়রা সরকারের কাছে জমি বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করেছে, কিন্তু তাদের আবেদন এক প্রকার উপেক্ষিত থেকেছে। উচ্ছেদের ভয় আর জমির সংকট তাদের জীবনকে উদ্বেগপূর্ণ করে তুলেছিল। এমন অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে তাদের আবেদন পুনর্বিবেচনা করার জন্য জোরালো দাবি তুলছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত: যুবকের নির্যাতন ও উত্তেজনা
ঘটনার শুরু হয় স্থানীয় যুবক জাহেদ এর নেতৃত্বে একদল তরুণ জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্দেশ্যে শহরের দিকে রওনা দিলে। বিমান বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটক করে এবং জাহেদকে ঘাঁটিতে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে। তার ওপর যে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়, তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। এসময় তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় যে, তার মতো কয়েকজন যুবককে যদি নষ্ট করে দেওয়া হয়, তাহলে কেউ কিছুই করতে পারবে না।
এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা ঘাঁটির সামনে জমা হয়। তারা জাহেদকে মুক্তির দাবি তোলে। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে, একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে এবং বিমান বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। এতে শিহাব নামে এক যুবক নিহত হন এবং অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত হন। কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের পর বিমান বাহিনী তাদের শক্তি প্রদর্শন করে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ঘটনাস্থলে যেতে বাধা দেয়।
আইএসপিআর ও গণমাধ্যমের ভূমিকা: সত্য আড়ালে রাখা
এ ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আইএসপিআর (বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অফিসিয়াল পিআর সংস্থা) এক বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতিকে ‘দুর্বৃত্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এতে সরাসরি স্থানীয় জনগণের উপর আক্রমণ চালানোর মতো ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু আইএসপিআরের বিবৃতিটি একপেশে ছিল এবং সত্যের দিকটি আড়াল করে ফেলেছে। যখন এসব ঘটনা ঘটছিল, তখন কক্সবাজারের স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে তাদের আটকে দেওয়া হয় এবং তারা কোনো ধরনের প্রতিবেদনে সংবাদ প্রচার করতে পারেননি।
তথ্য জানার অধিকারের প্রতি গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম আইএসপিআরের প্রেস নোটের ওপর নির্ভর করেছে, যা অগ্রহণযোগ্য। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন সত্য জনগণের কাছে পৌঁছানোর উপায়ও সংকুচিত হয়ে যায়।
বিমান বাহিনীর নির্যাতন: জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার
এটিই প্রশ্ন ওঠে, কি কারণে স্থানীয় জনগণের ওপর এত নৃশংসতা চালানো হলো? কী কারণে বিমান বাহিনী তাদের জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো? এমনকি তাদের প্রতি এতটা সহিংস মনোভাব কেন?


























