রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদেশি এসএমজি ও নগদ ১৪ লাখ টাকাসহ আটক ৪
- Update Time : ১০:২৭:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
- / ২৩৮ Time View

মোবারক হোসাইন , ঈদগাঁও উপজেলা।
কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে বিদেশি অস্ত্র কেনাবেচার সময় এপিবিএন ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন কুখ্যাত ডাকাত নবী হোসেনের তিন সহযোগী। এ সময় উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি অস্ত্র ও নগদ ১৪ লাখ টাকা।
রোববার সন্ধ্যায় ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি ব্লকে মাঝি এনায়েত (৪৫)-এর বাড়িতে অস্ত্র ব্যবসায়ী ইলিয়াস ও ডাকাত নবী হোসেনের মধ্যে অস্ত্র লেনদেন হচ্ছিল এমন খবরে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়।
এ অভিযানে আটককৃতরা হলেন, ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নাজিম উদ্দিনের ছেলে মো. ইয়াসির আরাফাত (২৭), একই ক্যাম্পের নুর বশরের ছেলে মো. মনসুর আহমদ (২৫) ও ক্যাম্প-১১ ইউসুফের ছেলে মো. আনাস (১৮) এবং ক্যাম্প-১২ এলাকার হাসিমুল্লাহর ছেলে মামুন রফিক (৫১)। তবে অভিযান শুরুর আগেই মূল অস্ত্র ব্যবসায়ী ইলিয়াস পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
@ ক্রয়-বিক্রয়ের গোপন চুক্তি ও মাঝির জবানবন্দি @
আটক মাঝি এনায়েত জানিয়েছেন, নবী হোসেন ও অস্ত্র ব্যবসায়ী ইলিয়াসের মধ্যে ১৯ লাখ ৫০ হাজার
টাকায় তিনটি বিদেশি অস্ত্র কেনাবেচার চুক্তি হয়। এর মধ্যে ১৪ লাখ টাকা আগেই পাঠানো হয়, যার বিনিময়ে একটি অস্ত্র হস্তান্তর করে ইলিয়াস। বাকি দুই অস্ত্র দেওয়া হতো পরবর্তী সাড়ে ৫ লাখ টাকা পৌঁছানোর পর।
তবে মাঝির দাবি, শুরুতে তার বাড়িতে এ ধরনের অস্ত্র লেনদেনের বিষয়ে তাকে কিছু জানানো হয়নি। যখন টাকার লেনদেন ও অস্ত্র নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন বিষয়টি সে বুঝতে পারে।
নবী হোসেন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ত্রাস
২০১৮ সালে পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায় সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা নবী হোসেন বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৮ ইস্টে তৈরি করেছেন একটি শক্তিশালী সামরিক আস্তানা। প্রায় ৩০ হাজার ইট ব্যবহার করে ১০ ফুট উঁচু প্রাচীরসহ ৬০০ ফিটের একটি ঘরে তৈরি করা হয়েছে সামরিক ঘাঁটি। পাশেই রয়েছে একটি বিশাল হল রুম, যেখানে টাঙানো রয়েছে সামরিক মানচিত্র।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই আস্তানায় নিযুক্ত রয়েছে কয়েকজন সাবেক চাকরিচ্যুত সেনা সদস্য, যারা নতুন সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের নেতৃত্ব দেয়। এসবের মধ্যে একজন সুমন মুন্সীকে সম্প্রতি র্যাব-১৫ গ্রেপ্তার করেছে।
গঠন করেন ‘আরকান রোহিঙ্গা আর্মি’
নবী হোসেন নিজস্ব একটি বাহিনী গঠন করেছেন, যার নাম আরকান রোহিঙ্গা আর্মি (ARA)। শুরুতে ‘রোহিঙ্গা স্বাধীনতার’ নামে প্রচারণা চালিয়ে প্রায় ৩০০ যুবককে মগজধোলাই করে নিজ বাহিনীতে যুক্ত করেন এবং সীমান্তবর্তী জঙ্গলে সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, নবী হোসেন পাকিস্তানে গিয়ে অস্ত্রচালনা ও সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়া হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরে আরসার সেকেন্ড ইন কমান্ডার হাসিমের সঙ্গে “তঞ্জিম” শপথ গ্রহণ করে চুক্তিবদ্ধ হন। তবে পরে তিনি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং সরাসরি সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইস, গরু, সিগারেট ও চোরাচালান করে আসছেন। এই বিশাল মা সিন্ডিকেটের মাসিক আয় ১০০-২০০ কোটি টাকা, যার একটি অংশ দেওয়া হয় দেশের কিছু দুর্নীতিবাজ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে।
নবী হোসেনের বিরুদ্ধে এক সময় বিজিবি ৪০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নানা সময়ে গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় আবারও ছাড়া পেয়ে সক্রিয় হন তিনি।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগসাজশ?
অভিযোগ আছে, নবী হোসেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের “টাকার মেশিন” ছিলেন। তার সহায়তায় নবী হোসেনকে একাধিকবার আটক করেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন। এই ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে চরম ক্ষোভ বিরাজ করে।
আদালতে জামিন, আতঙ্কে রোহিঙ্গারা
সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়ার ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা। তারা বলছেন, এমন ভয়ঙ্কর একজন সন্ত্রাসীকে মুক্তি দেওয়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি।
তারা সরকারের কাছে নবী হোসেনকে পুণরায় গ্রেপ্তার করে স্থায়ীভাবে কারাগারে রাখার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, অনুসন্ধানে জানা গেছে, নবী হোসেনের বাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান মাষ্টার আয়ুব নূর ও সামরিক কমান্ডার জুবাইরসহ আরও অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখনো সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
তাই নবী হোসেনকে আটক না করলে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জঙ্গি কার্যক্রম ও চোরাচালান ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, এমন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর জামিনে মুক্তি পাওয়া রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়। তারা সরকারের কাছে নবী হোসেনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি
জানিয়েছেন।


























