১০:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কালীগঞ্জে ব্যাগ তৈরি করে স্বাবলম্বী “হেলাই” গ্রামের ৫০০ নারী

Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৫৫:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ মার্চ ২০২৫
  • / ১২১ Time View

 

 

কালীগঞ্জ(ঝিনাইদহ)থেকে।
মোঃ মাহাবুবুর রহমান।

কালীগঞ্জ পৌর এলাকার চিত্রা পাড়ের হেলাই গ্রামের ৫ শতাধিক নারী ব্যাগ তৈরির কাজ করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। ঘর গৃহস্থলীর কাজ শেষে অবসর সময়ে বস্তা থেকে শপিং ও টিস্যু ব্যাগ তৈরি করে গৃহিণীরা প্রতিদিন যা আয় করছেন তা তাদের সংসারের কাজে লাগছে। এতে করে স্বচ্ছতা ফিরছে ওইসব নারীর সংসারে। একসাথে একই গ্রামের ৫ শতাধিক নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প কেবল উপজেলার হেলাই গ্রামেরই। যে কারণে আশপাশে সকলের নিকট গ্রামটি ব্যাগের গ্রাম হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। প্রবল ইচ্ছা শক্তি ও আগ্রহ থেকে কঠোর পরিশ্রম করে গ্রামের এ সকল নারী নিজেদেরকে করেছেন আত্মনির্ভরশীল এবং স্বাবলম্বী । খোঁজ নিয়ে জানা যায়,হেলাই গ্রামে বস্তা, টিস্যু এবং নন ওভেনের শপিং ব্যাগ তৈরি করা হয়ে থাকে। বর্তমানে নন ওভেন শপিং ব্যাগ তৈরিতে প্রায় ৫০ জন নারী শ্রমিক কাজ করলেও অধিকাংশ নারী কাজ করছেন বস্তার ব্যাগ তৈরিতে। লবণ, সার এবং বিভিন্ন ঔষধ এর বস্তা কেটে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ। মূলত ছোট মাঝারি এবং বড় এই তিন ধরনের ব্যাগ নারীরা তৈরি করে থাকেন। সেলাই মেশিন,মোটর লাগানো মেশিন এবং হাতের সাহায্যে তৈরি করা হয় এসব ব্যাগ।

ধরন অনুযায়ী ৩ থেকে ৪ টাকা মূল্যে প্রতিটি বস্তা কিনে তা থেকে দুইটি করে প্যাকেট বা ব্যাগ তৈরি করা সম্ভব হয়। এসব নারীদের তৈরিকৃত ছোটো ব্যাগ ৩ টাকা, মাঝারি ব্যাগ ৫ টাকা এবং বড় ব্যাগ ১০ টাকা মূল্যে খুচরা বাজারে বিক্রি হয়।এই গ্রামেই ছোটো বড় মিলে ব্যাগ ব্যবসায়ী আছে প্রায় শতাধিক।তারা বাইরে থেকে ট্রাক ভর্তি বস্তা কিনে তা পানিতে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে এরপর ব্যাগ তৈরির নারী শ্রমিকদের নিকট প্রদান করেন নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে। এরকম একজন নারী ব্যাগ ব্যবসায়ী হলেন আক্তার হোসেনের স্ত্রী রোকসানা বেগম। তিনি আগে নিজেই ব্যাগ তৈরির কাজ করতেন। গত দুই বছর হলো রোকসানা মাত্র ২,৪০০ টাকা দিয়ে ব্যাগ তৈরির ব্যবসা শুরু করেছিলেন।তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, ঘরে বসে না থেকে অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলাম ব্যবসা। এখন আমার ৫০ হাজার টাকা পুঁজি এসে দাঁড়িয়েছে। খরচ খরচা বাদে মাসে আমার প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় হয় । আমার মত গ্রামের অনেকেই এ কাজ করছেন। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে ব্যবসাটাকে আরো বড় করতে পারতেন বলেও তিনি যোগ করেন। রোকসানা বেগমের নিকট থেকে বস্তা নিয়ে ব্যাগ তৈরির কাজ করেন একই গ্রামের জহুরা বেগম। তিনিও একজন গৃহিণী। সংসারের কাজ সেরে তিনি প্রতিদিন ২০-২৫ ডজন ব্যাগ তৈরি করেন। এতে করে প্রতিদিন ১৭০-২০০ টাকা হারে মাসে প্রায় ৫-৬ হাজার টাকা আয় করেন তিনিও। পরিশ্রম করে আয় করতে পেরে খুশি জহুরা বেগম। হেলাই গ্রামের সব থেকে বড় বস্তা ব্যাবসায়ী মোকলেস হোসেন বলেন, প্রতি সপ্তাহে আমি ৫-৭ ট্রাক মাল কিনি। সব গ্রামেই বিক্রি হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের গ্রামে অধিকাংশ বাড়িতেই বিশেষ করে নারীরা বস্তার ব্যাগ তৈরির কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা তাদের কাজে এবং ব্যাগ বিক্রিতে সহায়তা করে থাকেন। বাজারে ব্যাগের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে হেলাই গ্রামের তৈরি হাত ব্যাগ চলে যাচ্ছে আশপাশের জেলা এবং উপজেলার ছোট বড় শহরে।উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাসলিমা বেগম বলেন,এক গ্রামে একসাথে ৫ শতাধিক নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্পটা সত্যিই প্রশংসনীয়। এসব কর্মজীবী আত্মনির্ভরশীল নারীদেরকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। একই সাথে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদেরকে কোনভাবে সহায়তা প্রদান করা যায় কিনা সে ব্যাপারে সদয় দৃষ্টি দেব। কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেদারুল ইসলাম বলেন,হেলাই গ্রামে স্বাবলম্বী নারীদেরকে আমি সম্মানন জানাচ্ছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংগ্রামী এ সকল নারীদের জন্য কিছু করার থাকলে অবশ্যই তা করব।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

কালীগঞ্জে ব্যাগ তৈরি করে স্বাবলম্বী “হেলাই” গ্রামের ৫০০ নারী

Update Time : ০৯:৫৫:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ মার্চ ২০২৫

 

 

কালীগঞ্জ(ঝিনাইদহ)থেকে।
মোঃ মাহাবুবুর রহমান।

কালীগঞ্জ পৌর এলাকার চিত্রা পাড়ের হেলাই গ্রামের ৫ শতাধিক নারী ব্যাগ তৈরির কাজ করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। ঘর গৃহস্থলীর কাজ শেষে অবসর সময়ে বস্তা থেকে শপিং ও টিস্যু ব্যাগ তৈরি করে গৃহিণীরা প্রতিদিন যা আয় করছেন তা তাদের সংসারের কাজে লাগছে। এতে করে স্বচ্ছতা ফিরছে ওইসব নারীর সংসারে। একসাথে একই গ্রামের ৫ শতাধিক নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প কেবল উপজেলার হেলাই গ্রামেরই। যে কারণে আশপাশে সকলের নিকট গ্রামটি ব্যাগের গ্রাম হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। প্রবল ইচ্ছা শক্তি ও আগ্রহ থেকে কঠোর পরিশ্রম করে গ্রামের এ সকল নারী নিজেদেরকে করেছেন আত্মনির্ভরশীল এবং স্বাবলম্বী । খোঁজ নিয়ে জানা যায়,হেলাই গ্রামে বস্তা, টিস্যু এবং নন ওভেনের শপিং ব্যাগ তৈরি করা হয়ে থাকে। বর্তমানে নন ওভেন শপিং ব্যাগ তৈরিতে প্রায় ৫০ জন নারী শ্রমিক কাজ করলেও অধিকাংশ নারী কাজ করছেন বস্তার ব্যাগ তৈরিতে। লবণ, সার এবং বিভিন্ন ঔষধ এর বস্তা কেটে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ। মূলত ছোট মাঝারি এবং বড় এই তিন ধরনের ব্যাগ নারীরা তৈরি করে থাকেন। সেলাই মেশিন,মোটর লাগানো মেশিন এবং হাতের সাহায্যে তৈরি করা হয় এসব ব্যাগ।

ধরন অনুযায়ী ৩ থেকে ৪ টাকা মূল্যে প্রতিটি বস্তা কিনে তা থেকে দুইটি করে প্যাকেট বা ব্যাগ তৈরি করা সম্ভব হয়। এসব নারীদের তৈরিকৃত ছোটো ব্যাগ ৩ টাকা, মাঝারি ব্যাগ ৫ টাকা এবং বড় ব্যাগ ১০ টাকা মূল্যে খুচরা বাজারে বিক্রি হয়।এই গ্রামেই ছোটো বড় মিলে ব্যাগ ব্যবসায়ী আছে প্রায় শতাধিক।তারা বাইরে থেকে ট্রাক ভর্তি বস্তা কিনে তা পানিতে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে এরপর ব্যাগ তৈরির নারী শ্রমিকদের নিকট প্রদান করেন নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে। এরকম একজন নারী ব্যাগ ব্যবসায়ী হলেন আক্তার হোসেনের স্ত্রী রোকসানা বেগম। তিনি আগে নিজেই ব্যাগ তৈরির কাজ করতেন। গত দুই বছর হলো রোকসানা মাত্র ২,৪০০ টাকা দিয়ে ব্যাগ তৈরির ব্যবসা শুরু করেছিলেন।তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, ঘরে বসে না থেকে অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলাম ব্যবসা। এখন আমার ৫০ হাজার টাকা পুঁজি এসে দাঁড়িয়েছে। খরচ খরচা বাদে মাসে আমার প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় হয় । আমার মত গ্রামের অনেকেই এ কাজ করছেন। সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে ব্যবসাটাকে আরো বড় করতে পারতেন বলেও তিনি যোগ করেন। রোকসানা বেগমের নিকট থেকে বস্তা নিয়ে ব্যাগ তৈরির কাজ করেন একই গ্রামের জহুরা বেগম। তিনিও একজন গৃহিণী। সংসারের কাজ সেরে তিনি প্রতিদিন ২০-২৫ ডজন ব্যাগ তৈরি করেন। এতে করে প্রতিদিন ১৭০-২০০ টাকা হারে মাসে প্রায় ৫-৬ হাজার টাকা আয় করেন তিনিও। পরিশ্রম করে আয় করতে পেরে খুশি জহুরা বেগম। হেলাই গ্রামের সব থেকে বড় বস্তা ব্যাবসায়ী মোকলেস হোসেন বলেন, প্রতি সপ্তাহে আমি ৫-৭ ট্রাক মাল কিনি। সব গ্রামেই বিক্রি হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের গ্রামে অধিকাংশ বাড়িতেই বিশেষ করে নারীরা বস্তার ব্যাগ তৈরির কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা তাদের কাজে এবং ব্যাগ বিক্রিতে সহায়তা করে থাকেন। বাজারে ব্যাগের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে হেলাই গ্রামের তৈরি হাত ব্যাগ চলে যাচ্ছে আশপাশের জেলা এবং উপজেলার ছোট বড় শহরে।উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাসলিমা বেগম বলেন,এক গ্রামে একসাথে ৫ শতাধিক নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্পটা সত্যিই প্রশংসনীয়। এসব কর্মজীবী আত্মনির্ভরশীল নারীদেরকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। একই সাথে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদেরকে কোনভাবে সহায়তা প্রদান করা যায় কিনা সে ব্যাপারে সদয় দৃষ্টি দেব। কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেদারুল ইসলাম বলেন,হেলাই গ্রামে স্বাবলম্বী নারীদেরকে আমি সম্মানন জানাচ্ছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংগ্রামী এ সকল নারীদের জন্য কিছু করার থাকলে অবশ্যই তা করব।